ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সংঘাত ও উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে অনেক বিশ্লেষকের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হিসেবে উঠে আসছে চীন ও ইসরাইল। আর সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে অনেকেই দেখছেন যুক্তরাষ্ট্র-কেই।
ইসরাইল প্রকাশ্যেই চায় এই সংঘাত আরও কিছুদিন স্থায়ী হোক, যাতে আঞ্চলিক সমীকরণ তার অনুকূলে যায়। অন্যদিকে চীন সরাসরি কিছু না বললেও নীরবে এমন পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে তার কৌশলগত সুবিধা বাড়ে বলেই ধারণা করা হয়। ভবিষ্যতে নিজেদের স্বার্থে চীন ও ইসরাইলের মধ্যে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হতে পারে, এমন সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এদিকে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে, যদিও তা এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত নয়। অন্যদিকে ভারত অনেকটা পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় রয়েছে। পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, কিন্তু সরাসরি কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না, বা নিতে পারছে না।
ইসরাইলের আরেকটি কৌশলগত লক্ষ্য হতে পারে ন্যাটো-কে তুলনামূলকভাবে দুর্বল করে ফেলা। কারণ, তাদের গ্রেটার ইসরাইল পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সিরিয়ার দিকে আরও আগ্রাসীভাবে অগ্রসর হতে গেলে তুরস্ক-এর সঙ্গে সংঘাতের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য হওয়ায়, তখন ন্যাটো একটি বড় বাধা হিসেবে সামনে দাঁড়াবে।
এই প্রেক্ষাপটে ন্যাটোকে দুর্বল করার একটি কৌশলগত প্রচেষ্টার কথাও আলোচনায় আসছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রকেও পরোক্ষভাবে চাপের মধ্যে রাখা হচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ন্যাটো নিয়ে যে বিতর্ক রয়েছে, তা কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনোভাবে ন্যাটো থেকে দূরে সরে যায়, তাহলে জোটটি স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল হয়ে পড়বে। এতে রাশিয়া ইউরোপে তার প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে এমন পরিস্থিতিতে রাশিয়া ও ইসরাইলের সম্পর্কেও কৌশলগত সমন্বয় বাড়তে পারে, যা ইসরাইলের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন-কে ঘিরে এখন প্রায়ই শোনা যায়, এটি অনেকটা ক্লাবসদৃশ কাঠামোতে পরিণত হয়েছে। আগের মতো ঐক্য, গতিশীলতা ও জৌলুস ধরে রাখা তাদের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। তবুও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য ইউরোপের মতো একটি আঞ্চলিক ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। সেই বাস্তবতায় দক্ষিণ এশিয়া এখন সবচেয়ে সম্ভাবনাময় একটি অঞ্চল।
এশিয়াতেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক জোট গড়ে ওঠার বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এর জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক আস্থা, অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত যদি আধিপত্যবাদী মনোভাব থেকে সরে এসে সহযোগিতামূলক নেতৃত্ব গ্রহণ করে, তাহলে একটি কার্যকর ও টেকসই আঞ্চলিক কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব।
এদিকে তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোকে নিয়ে একটি ইউরোপীয় ইউনিয়নধর্মী জোট গঠনের চেষ্টা করছে। কিন্তু ওই অঞ্চলে রাশিয়ার শক্তিশালী প্রভাব এখনো এই উদ্যোগকে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে।
সবশেষে, বিশ্ব দ্রুত একমেরু থেকে বহুমেরু ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশ-এর জন্য যেমন কিছু ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, তেমনি নতুন সুযোগও তৈরি হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো একটি শক্তিশালী, গবেষণাভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি-কেন্দ্রিক একাডেমিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা, যা ভবিষ্যতে দেশের কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও সুসংহত ও কার্যকর করে তুলতে পারবে।

Comments
Post a Comment