১৮ জিলহজ ঐতিহাসিক গাদীরে খুমের ঘটনা ও ২৪ জিলহজ ঐতিহাসিক মুবাহিলার ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। এ দুই ঘটনার মাধ্যমে নবীজি সাঃ এর আহলে বাইতের শান মান মর্যাদা প্রকাশ পায়। কিন্তু খুব দুঃখজনক হলেও সত্য যে আমাদের বাংলাদেশের প্রায় অনেক মুসলিমরা এই গাদীরে খুম ও মুবাহিলার ঘটনা প্রসঙ্গে তেমন কিছুই জানে না। অপরদিকে ১৮ জিলহজ গাদীরে খুমের ঘটনার স্মরণে শিয়ারা ঈদে গাদীর ও ২৪ জিলহজ ঐতিহাসিক মুবাহিলার ঘটনার স্মরণে ঈদে মুবাহিলা এ দুটি আনন্দ উৎসব পালন করে থাকে।
১৮ জিলহজ্জ, ১০ম হিজরী সন। প্রিয়নবী ﷺ বিদায় হজ্জ শেষে মক্কা শরীফ থেকে মদিনা শরিফ অভিমুখে ফিরছেন। প্রায় ১ লক্ষ ১৫ হাজার সাহাবায়ে কেরামের সবাই যে যার যার গন্তব্যের দিকে রওয়ানা দিয়েছেন।মক্কা শরীফ ও মদিনা শরিফের মধ্যবর্তী "গাদিরে খুম" নামক পানির উৎসের কাছে কাফেলা পৌঁছালে সেখানে যাত্রাবিরতি করেন। তাবু টানানো হলো ও মিম্বর নির্মাণ হলো। সেখানে সাহাবায়ে কেরামকে উদ্দেশ্য করে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ প্রদান করেন।
তিনি আল্লাহর প্রশংসা করার পর উম্মতের জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—আল্লাহর কিতাব (কুরআন) এবং আহলে বায়ত (নবী পরিবারের সদস্যগণ)—আঁকড়ে ধরার উপদেশ দেন। এ বিষয়টি বিভিন্ন হাদিস গ্রন্থে “হাদিসে সাকালাইন” নামে বর্ণিত হয়েছে। কিছু বর্ণনায় এসেছে যে, এ দুটি বিষয়ে যত্নবান হওয়ার প্রতি নবী ﷺ বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন এবং কিয়ামত পর্যন্ত এদের গুরুত্ব অটুট থাকবে।এরপর একপর্যায়ে মহানবী সাঃ হযরত আলী (রাদিঃ আঃ) এর হাত ধরে বলেন
"من كنت مولاه فهذا عليّ مولاه ، اللهم والِ من والاه وعادِ من عاداه "
( মান কুনতু মাওলা ফাহাযা আলী মাওলা আল্লাহুম্মা ওয়ালি মান ওয়ালাহু ওয়া আদি মান আদাহু)
অর্থ : " আমি যার মাওলা আলী (রাদিআল্লাহু আনহু ও আলাইহিমুস সালাম উভয়ই) তার মাওলা, হে আল্লাহ! যে আলী (রা.)-কে বন্ধু মনে করে, তুমিও তাকে বন্ধু মনে কর। আর যে আলী (রা.) এর সাথে দুশমনি করে, তুমিও তার সাথে দুশমনি কর।” (সুনানে তিরমিজি,মুসনাদে ইমাম আহমদ ও আস সাওয়ায়েকুল মুহরিকা)। উল্লেখ্য যে গদিরে খুম সংক্রান্ত উপরের এই হাদিসগুলো অর্থগত বা মা'নান মুতাওয়াতির পর্যায়ের হাদিস। যা সহিহ হাদিসের সর্বোচ্চ পর্যায়ের। ১৮ জিলহজ্জ গদিরে খুমে প্রিয়নবী ﷺর সেই ঘোষণার পর হজরত ওমর ফারুক রা. ই প্রথম সাহাবি যিনি হজরত আলি রা. কে অভিনন্দন জানান এই বলে, "হে আলি! আবু তালিবের পুত্র! তুমি সকল মুমিন মুমিনার মাওলা হয়ে গেলে।" একে একে হজরত আবু বকর সিদ্দিক রা. সহ সকল সাহাবায়ে কেরাম মাওলা আলি আ. কে অভিনন্দন জানালেন। - (মুসনাদে আহমদ ইবনে হাম্বল) গাদীরে খুমের এ হাদিসটা মূলত তৎকালীন সময়ে ইয়েমেনে আলী (রাঃ) এর বিরোধীদেরকে তার প্রতি অনুগত করার জন্য এবং আলী রাঃ এর শান মান মর্যাদা বিষয়ে, এখানে আমাদের দৃষ্টিতে মাওলা শব্দের অর্থ বন্ধু, অভিভাবক বা সম্মান ও আনুগত্যের যোগ্য ব্যক্তি । তবে অবশ্য শিয়ারাও মাওলা শব্দের অর্থ অভিভাবক বলছে।
গাদীরে খুমের ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিয়া সম্প্রদায়ের মুসলিমরা ও সমমনা কিছু সুফিপন্থীরা ঈদে গাদীরে খুম পালন করে কেননা তারা মাওলা শব্দের অর্থ ইমাম বা খলিফা কে ইঙ্গিত করে থাকে । অথচ আমাদের দৃষ্টিতে মাওলা মানে ইমাম বা খলিফা নয়। আমরা জানি ইসলাম পরিপূর্ণ হওয়ার ব্যাপারে কুরআনের আয়াতটি বিদায় হজে ৯ জিলহজ আরাফার ময়দানে নাজিল হয়েছিল কিন্তু শিয়া সম্প্রদায়ের বিশ্বাস তারা বলে গাদীরে খুমের দিনেই দ্বীন ইসলাম পরিপূর্ণ হয়েছিল ও কুরআনে সুরা মায়েদার দুইটা আয়াত ১৮ জিলহজে গাদীরে খুমে নাজিল হয়েছিল তাই তারা একে ইসলাম পরিপূর্ণ হওয়ার ঈদ হিসেবে পালন করেন যদিও তাফসিরে দুররে মনসুর এর আলোকে জানা যায় সুরা মায়েদার যে আয়াতে দ্বীন ইসলাম পরিপূর্ণ হওয়ার কথা এসেছিল সেই আয়াত গাদীরে খুমে নাজিল হয়েছিল তা দুর্বল মত । আর ১৮ জিলহজে ঈদে গাদীর পালন এটি গাদীরের ঘটনার ৩৪০ বছর পরে আব্বাসীয় খিলাফতের আমলে বাগদাদে মুইজুদ্দৌলা নামে এক শিয়া শাসক আরম্ভ করেছিল। তাই সুন্নি মুসলিমরা গাদীরের ঘটনা বিশ্বাস করলেও ঈদে গাদীর পালন থেকে বিরত থাকে।
মুবাহালা ইসলামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যা ৯ম বা ১০ম হিজরিতে ২৪ জিলহজে সংঘটিত হয়। এ ঘটনা কুরআনের সূরা আলে ইমরানের ৬১ নম্বর আয়াতের সাথে সম্পর্কিত। ইয়েমেনের নাজরান অঞ্চলের একদল খ্রিস্টান প্রতিনিধি মদিনায় এসে রাসূলুল্লাহ সাঃ -এর সাথে ঈসা (আ.)-এর মর্যাদা ও প্রকৃতি সম্পর্কে আলোচনা করেন। তারা বিশ্বাস করতেন যে ঈসা (আ.) আল্লাহর পুত্র বা ঐশী সত্তার অংশ, কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ তাদের সামনে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন যে ঈসা (আ.) আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।দীর্ঘ বিতর্কের পর যখন তারা সত্য গ্রহণ করলেন না, তখন আল্লাহ তাআলা এ আয়াত নাযিল করেন: "তোমার কাছে জ্ঞান আসার পরও যদি কেউ এ বিষয়ে তোমার সাথে বিতর্ক করে, তবে বল: এসো, আমরা আমাদের সন্তানদের ও তোমাদের সন্তানদের, আমাদের নারীদের ও তোমাদের নারীদের, আমাদের নিজেদের ও তোমাদের নিজেদের ডাকি; অতঃপর আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি এবং মিথ্যাবাদীদের ওপর আল্লাহর লানত কামনা করি।" (সূরা আলে ইমরান ৩:৬১)
রাসূলুল্লাহ সাঃ মুবাহালার জন্য মাওলা আলী রাঃ, সাইয়্যিদা ফাতিমা যাহরা রাঃ, ইমাম হাসান রাঃ ও ইমাম হোসাইন রাঃ কে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন । যখন নাজরানের খ্রিস্টান নেতারা রাসূলুল্লাহ সাঃ কে তাঁর নিকটতম পরিবার নিয়ে মুবাহালার জন্য আসতে দেখলেন, তখন তারা পরস্পর পরামর্শ করে মুবাহালায় অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেন। তারা বুঝতে পারেন যে তিনি তাঁর সবচেয়ে প্রিয় ও সম্মানিত মানুষদের নিয়ে এসেছেন; যদি তিনি মিথ্যাবাদী হতেন, তবে এমন ঝুঁকি নিতেন না। অতঃপর তারা মুবাহালা থেকে সরে দাঁড়ায় এবং মুসলিম রাষ্ট্রের সাথে শান্তিচুক্তি ও জিযিয়া প্রদানে সম্মত হয়।
সুন্নি আলেমদের মতে এই ঘটনায় কয়েকটি বিষয় প্রমাণিত হয়: রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সত্যতার একটি বড় দলিল।
আহলে বাইতের (বিশেষত আলী, ফাতিমা, হাসান ও হুসাইন রা.) অসাধারণ মর্যাদা ও ফজিলত।
মুবাহালায় তাদের নির্বাচন প্রমাণ করে যে তারা নবী সাঃ -এর সবচেয়ে নিকটবর্তী ও পবিত্র পরিবারভুক্ত।
তবে অধিকাংশ সুন্নি আলেম এ ঘটনাকে খিলাফতের একচ্ছত্র দলিল হিসেবে গ্রহণ করেন না; বরং এটিকে আহলে বাইতের ফজিলত ও মর্যাদার প্রমাণ হিসেবে দেখেন।
মুবাহিলার এ ঘটনা তাফসীরে ইবনে কাসির, তাফসীরে তাবারী, হাদিসগ্রন্থ সহীহ মুসলিম ও তিরমিজিতে উল্লেখ আছে।
মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন আমিন।

Comments
Post a Comment